খলিফাতাবাদের কারিগর

ভৈরব নদের পাড়ে লোনা হাওয়া। দক্ষিণে সুন্দরবনের সবুজ দেয়াল। এই ভূখণ্ডেই পনেরো শতকে একজন মানুষ নগর গড়েছিলেন, পথ বানিয়েছিলেন, দিঘি কাটিয়েছিলেন। মসজিদের মিনারে তুলেছিলেন আজানের ধ্বনি। তাঁর নাম খান জাহান। ১৪৫৯ সালের ২৫ অক্টোবর, হিজরি ৮৬৩ সালের ২৭ জিলহজ, তিনি মারা যান।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, খান জাহানের সমাধিফলকে খোদাই করা আছে তাঁর দুটি উপাধি, ‘উলুগ খান’ ও ‘খান-ই-আযম’। তাঁর সময়ে গৌড়ের সিংহাসনে ছিলেন সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৪৩৫–১৪৫৯)। ইতিহাসবিদদের ধারণা, খান জাহান গৌড়ের সুলতানের প্রতি অনুগত ছিলেন। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার যে বিস্তীর্ণ জনপদ তিনি শাসন করতেন, তার নাম খলিফাতাবাদ। এর বিস্তার ছিল উত্তরে নড়াইলের নলদী পর্যন্ত, আর রাজধানী ছিল আজকের বাগেরহাটে।
শাসকের পরিচয় ছাপিয়ে খান জাহান বেঁচে আছেন নির্মাতা হিসেবে। প্রায় ১৪৫০ সালে তিনি বাগেরহাটে গড়েন ষাট গম্বুজ মসজিদ। ইট আর পোড়ামাটিতে গড়া সেই স্থাপত্যরীতি পরে পরিচিত হয় ‘খান জাহানি রীতি’ নামে। শুধু মসজিদ নয়, তাঁর হাতে জন্ম নেয় খলিফাতাবাদ, মারুলী কসবা, পয়গ্রাম কসবা, বারোবাজারের মতো জনপদ। মানুষের চলাচলের জন্য বানান সড়ক আর সেতু, পথিকের জন্য সরাইখানা, জ্ঞানচর্চার জন্য মাদ্রাসা।
লোনা মাটির দেশে মিঠা পানির অভাব ছিল চিরকালের। খান জাহান সেই অভাব মেটাতে কাটালেন দিঘি। তাঁর সমাধির পাশের খাঞ্জালি দিঘি আর ষাট গম্বুজ মসজিদের পশ্চিমের ঘোড়া দিঘি আজও টলটলে জলে সেই দূরদর্শিতার সাক্ষ্য দেয়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ঘোড়া দিঘির দৈর্ঘ্য দেড় হাজার ফুট, প্রস্থ সাড়ে সাত শ ফুট।
এ জনপদের মানুষ তাঁকে মনে রেখেছে শাসকের চেয়ে বেশি একজন সাধক হিসেবে। নামের আগে জুড়েছে শ্রদ্ধার ‘হজরত’। দক্ষিণবঙ্গে ইসলামের আলো ছড়ানোর ইতিহাসে খান জাহান এক উজ্জ্বল নাম, যিনি তলোয়ারের চেয়ে বেশি ভরসা রেখেছিলেন ইট, পানি আর পথের ওপর। বাগেরহাটের এই মসজিদ-নগরী ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে।
সাড়ে পাঁচ শ বছরের বেশি সময় পেরিয়েছে। ষাট গম্বুজের খিলানে এখনো নামাজ পড়েন মুসল্লিরা। খাঞ্জালি দিঘির ঘাটে এখনো নামে মানুষ। খলিফাতাবাদের কারিগর চলে গেছেন, তাঁর গড়া পথে এখনো হাঁটে বাংলা।
ইতিহাসে আজকের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
১৯৩৪ | মেদিনীপুরে দুই বিপ্লবীর ফাঁসি
ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগঠন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের দুই সদস্য ব্রজকিশোর চক্রবর্তী ও রামকৃষ্ণ রায়কে এদিন মেদিনীপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি দেয় ব্রিটিশ সরকার। ১৯৩৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর পুলিশ মাঠে ফুটবল খেলার সময় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বার্নার্ড বার্জকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে দুজনের সাজা হয়। ব্রজকিশোরের বয়স তখন মাত্র একুশ।
১৯৭১ | ৮ নম্বর সেক্টরে তিন ঘণ্টার লড়াই
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, এদিন ৮ নম্বর সেক্টরের মান্দাভাগ, মঙ্গলপুর ও শ্রীপুরে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানে বিমান থেকে হামলা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। প্রায় তিন ঘণ্টার লড়াইয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ৫৮ জন হতাহত হয়। শহীদ হন দুই মুক্তিযোদ্ধা, আহত হন নয়জন। একই দিনে ময়মনসিংহের কামালপুর সীমান্তে পাকিস্তানি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করেন মুক্তিযোদ্ধারা। ফুলবাড়িয়া থানায় রাজাকারদের ওপর হামলায় ৩০ রাজাকার নিহত হয়।
১৯৭১ | নেপালে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য ঘোষণা
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তথ্যমতে, নেপালে পাকিস্তান দূতাবাসের কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান এদিন পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন।
১৯৭৫ | কবিশেখর কালিদাস রায়ের মৃত্যু
রবীন্দ্রযুগের কবি, প্রাবন্ধিক ও পাঠ্যবই লেখক কালিদাস রায় এদিন মারা যান। তাঁর জন্ম ১৮৮৯ সালের ২২ জুন। পল্লিবাংলার ছবি, বৈষ্ণব ভক্তি আর সংযত দার্শনিকতা তাঁর কবিতার পরিচয়।




