যে বরফযুগ আসতে আসতেও এল না

কানাডার উত্তরে বাফিন দ্বীপের তুন্দ্রায় পাথরের গায়ে লেগে আছে শ্যাওলা আর লাইকেন। চোখে পড়ার মতো কিছু নয়, ঠান্ডা মাটির নিরীহ বাসিন্দা মাত্র। অথচ এই শ্যাওলাই এখন একটি বড় প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্সে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণা বলছে, পৃথিবী হয়তো আরেকটি বরফযুগের দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু মানুষ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়াতে শুরু করার পর সেই যাত্রা থেমে গেছে।
এর সূত্র খুঁজতে ফিরতে হয় ১২ হাজার বছর আগে, যখন শেষ বরফযুগ ফুরোচ্ছিল। তখন লরেন্টাইড বরফস্তর (Laurentide Ice Sheet) ঢেকে রেখেছিল গোটা কানাডা, দক্ষিণে নেমে গিয়েছিল আজকের নিউইয়র্ক আর মার্কিন মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত। সেই বিশাল বরফ গলতে গলতে আজ পড়ে আছে তার শেষ চিহ্ন, বাফিন দ্বীপের বার্নস আইস ক্যাপ (Barnes Ice Cap)। আয়তনে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যের সমান।
পৃথিবী এমন বরফযুগ বারবার দেখেছে। নিজের অক্ষে ঘোরার ভঙ্গি আর সূর্যকে প্রদক্ষিণের কক্ষপথে স্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে, যাকে বলে মিলানকোভিচ চক্র (Milankovitch Cycles), মেরু থেকে বরফ নেমে আসে নিচের দিকে। তারপর আসে উষ্ণ আন্তঃহিমযুগ, বরফ ফিরে যায় মেরুর দিকে। এই ছন্দেই চলছিল সবকিছু।
বার্নস আইস ক্যাপের একটি বিশেষত্ব আছে। সাধারণ হিমবাহের মতো এটি গড়িয়ে চলে না, পাথরের সঙ্গে জমে থাকে। ফলে বরফ এগোলে নিচে যা চাপা পড়ে, তা অক্ষত থাকে। গবেষণার প্রধান লেখক কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লামন্ট-ডোহার্টি আর্থ অবজারভেটরির পুরাজলবায়ুবিদ নিকোলাস ইয়াং। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছেন।
প্রথমে তাঁরা জানতে চেয়েছেন, বরফ কবে আজকের আকারে পৌঁছেছিল। হিমবাহের কিনারা থেকে কয়েক মিটার দূরের পাথর কত দিন খোলা আকাশের নিচে আছে, তা মাপা হয়েছে বেরিলিয়াম-১০ নামের একটি মৌলের পরিমাণ দেখে। পাথর আকাশের দিকে খোলা থাকলে তার গায়ে এই মৌল জমে। হিসাব বলছে, প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বছর আগে বরফ আজকের আকারে পৌঁছায়।
এরপর গবেষকেরা নজর দেন শ্যাওলার দিকে। ইয়াং বলেন, “বরফ সরে যাওয়ার পর খোলা জমিতে শ্যাওলা জন্মায়। সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলে। তারপর একসময় বরফ আবার এগোতে শুরু করে, শ্যাওলাকে ঢেকে দেয়, মেরে ফেলে।” বরফের নিচে চাপা পড়া সেই মৃত শ্যাওলা যেন সময়ের সমাধিফলক। বরফ সরে গিয়ে জমি নতুন করে বেরিয়ে এলে সেই চিহ্ন দেখে গবেষকেরা পড়েছেন বরফ কবে কতটা এগিয়েছিল। তাঁদের হিসাবে, প্রায় দুই হাজার বছর আগে বার্নস আইস ক্যাপ আবার বাড়তে শুরু করে। হতে পারে, এটিই ছিল নতুন এক হিমযুগের প্রথম পদক্ষেপ।
কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে বরফ হঠাৎ উল্টো পথ ধরে। ঐতিহাসিক আকাশচিত্রে দেখা যায়, বরফ পিছু হটছে, নিজের নতুন সীমানা ছেড়ে ফিরে যাচ্ছে। ১৯৮০-এর দশক থেকে এর কিনারা বছরে গড়ে চার মিটার করে সরে এসেছে। ঠিক এই সময়েই দ্রুত বেড়েছে কার্বন নিঃসরণ, যার কারণে পৃথিবীজুড়ে বরফ গলছে। ইয়াংয়ের ভাষায়, “এই হিমবাহের সাম্প্রতিক পিছু হটা দুই হাজার বছরের সম্প্রসারণকে উল্টে দিয়েছে।”
মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক অ্যান্ড্রু উইকার্ট এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন ঘোরে: আমরা কি এত উষ্ণতা বাড়িয়েছি যে পরের বরফযুগই থেমে গেছে? তাঁর মতে, এই গবেষণা দেখাচ্ছে, নিঃসরণ বাড়তে শুরু করার প্রায় শুরুতেই আমরা যথেষ্ট ক্ষতি করে ফেলেছি, উত্তর আমেরিকার প্রধান বরফস্তর পিছু হটতে শুরু করেছে। “এটা তাৎপর্যপূর্ণ,” বলেছেন তিনি।
সবাই অবশ্য পুরো উপসংহারে পৌঁছাতে রাজি নন। ডার্টমাউথ কলেজের ভূবিজ্ঞানের অধ্যাপক মেরেডিথ কেলি গবেষণার তথ্যকে “দারুণ” বলেছেন। তাঁর মতে, বরফ কী করছিল, তার স্পষ্ট চিত্র এতে আছে। তবে মানুষের তৈরি উষ্ণতার আগে পৃথিবী ঠিক কীভাবে হিমযুগের দিকে যাচ্ছিল, তা বুঝতে বিশ্বের অন্য জায়গার তথ্যের সঙ্গে তুলনা দেখতে চান তিনি। বরফযুগ কীভাবে শুরু হয়, তার মোটা দাগের ধারণা থাকলেও সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া নিয়ে আরও গবেষণা দরকার।
এই গবেষণা পাঁচ দশক আগের একটি বিতর্কও নতুন করে সামনে এনেছে। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানীরা বৈঠকে বসেছিলেন পরের বরফযুগ নিয়ে। তাঁরা মনে করেছিলেন, হিমযুগ এতটাই আসন্ন যে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে সতর্ক করে চিঠি পাঠান। ইয়াং জানিয়েছেন, এই গবেষণার দুজন সহলেখক সেই বৈঠকে ছিলেন। পরে সেই বৈঠক আর সত্তরের দশকের একটি শীতল সময়কে জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকারকারীরা দীর্ঘদিন “প্রমাণ” হিসেবে দেখিয়েছেন যে বৈশ্বিক উষ্ণতা আসলে ঘটছে না। ইয়াং বলছেন, “আমার মনে হয়, এই গবেষণা বরং দেখায়, আসন্ন হিমযুগ নিয়ে বিজ্ঞানীরা ঠিকই বলেছিলেন।”
অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা ভুল ছিলেন না। বরফ সত্যিই আসছিল। কিন্তু তার আগেই মানুষের চিমনি আর ইঞ্জিন থেকে উঠে আসা ধোঁয়া পৃথিবীর ছন্দ বদলে দিয়েছে। বাফিন দ্বীপের শ্যাওলা তার নীরব সাক্ষী, যে বরফযুগ আসতে আসতেও এল না।
তথ্যসূত্র: ওয়্যার্ড, সায়েন্স সাময়িকী

