মূল কনটেন্টে যান
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার ১২ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ৩০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
অনুসন্ধানী ও সর্বশেষ বাংলা সংবাদ
সর্বশেষ

ইঞ্জিন বিকল হয়ে শিবসায় আটকে ১২ জন, সুন্দরবন ভ্রমণের এক ভয়াবহ রাত

৯ অক্টোবর শুক্রবার কয়রা থেকে ১২ জনের একটি পর্যটক দল কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের ঘাট থেকে ট্রলারে সুন্দরবন ভ্রমণে যায়। বিকেল ৪টার দিকে কালাবাগী এলাকায় ইঞ্জিন বিকল হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করেও চালু না হওয়ায় রাত ৯টার দিকে মাঝি জানান, ইঞ্জিন আর চালু করা সম্ভব…

কালাবাগী ওয়াচ টাওয়ার থেকে সুন্দরবনের দৃশ্য
শিবসা নদীর তীরে সুন্দরবন, যেখানে ইঞ্জিন বিকল হয়ে আটকে পড়েছিল পর্যটকবাহী ট্রলারছবি: সংগৃহীত

অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যে রাত জীবনের অন্যতম ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে, তা ভাবিনি। চারপাশে সবুজ বন, নদীর ঢেউ আর মুক্ত বাতাস, সব মিলিয়ে শুরুটা ছিল আনন্দের। কিন্তু বিকেলে ট্রলারের (trawler) ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর সেই আনন্দ ধীরে ধীরে রূপ নেয় উৎকণ্ঠা আর আতঙ্কে। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী, শিশু সন্তান ও স্বজনেরা। সামনে উত্তাল শিবসা নদী, চারপাশে ঘন অন্ধকার, আর যোগাযোগের জন্য মোবাইল নেটওয়ার্কও ছিল না। শেষ পর্যন্ত এক স্থানীয় মাঝির সহায়তায় রাত পেরিয়ে নিরাপদে ফিরতে পেরেছিলাম আমরা। গত ৯ অক্টোবর শুক্রবার সকালে শুরু হওয়া এই ভ্রমণ আমাদের কাছে স্মরণীয় এক রাতের গল্প হয়ে থাকবে। সেই রাত শিখিয়েছে, প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভ্রমণে নিরাপত্তার বিষয়টিও কতটা জরুরি।

আনন্দ নিয়ে যাত্রা শুরু

সকাল ১০টায় কয়রা সদর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে মঠবাড়ী সুতির অফিস লঞ্চঘাটে, অর্থাৎ কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের ঘাটে পৌঁছাই আমরা। আমার সঙ্গে ছিলেন ভগ্নিপতি মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি কয়রা ব্লাড ব্যাংকের সভাপতি, কয়রা প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক এবং সাংবাদিক। আমাদের চারটি পরিবারের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েসহ মোট ১২ সদস্যের একটি দল ছিল। কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন থেকে মাঝারি আকারের একটি ট্রলার ভাড়া করে শুরু হয় নদীপথের যাত্রা।

কয়রা নদী পেরিয়ে ট্রলার শিবসার বুকে এগোতেই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে শিশুরা। নদীর দুই পাশের প্রকৃতি আর সুন্দরবনের সবুজ সবাইকে মুগ্ধ করছিল। পথে চোখে পড়ে কালাবাগী দ্বীপের ঝুলন্ত ঘর। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুত বহু পরিবার জীবনসংগ্রাম চালাচ্ছে। কাছের আরেকটি ছোট দ্বীপেও শতাধিক পরিবার থাকে। দ্বীপটির স্থানীয় কোনো নাম নেই। আগে এটি কালাবাগী বাজারের সঙ্গে যুক্ত ছিল, কিন্তু নদীভাঙনে বাজার ও প্রধান স্থলপথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বাজার করা আর শিশুদের স্কুলে যাতায়াতের প্রধান ভরসা এখন ছোট ডিঙিনৌকা। জোয়ারের সময় বেশির ভাগ ঘরের উঠানে, কোনো কোনো ঘরের মেঝেতেও পানি ওঠে। ঘূর্ণিঝড় বা অন্য দুর্যোগ হলে এই পরিবারগুলোর কী হবে, সেই আশঙ্কা থেকেই বলতে চাই, তাঁদের নিরাপত্তা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।

বেলা বাড়ার সঙ্গে রোদের তাপ বাড়ছিল। তবে কালাবাগী ওয়াচ টাওয়ারে (watchtower) ওঠার পর ক্লান্তি অনেকটাই দূর হয়ে যায়। উঁচু টাওয়ার থেকে যত দূর চোখ যায়, সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ সবুজ। দূরের বনে হরিণের ছোটাছুটি আর গাছের ডালে বানরের লাফালাফি শিশুদের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দেয়।

ইঞ্জিন বিকল, বাড়তে থাকে আতঙ্ক

ট্রলারে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেল চারটার দিকে ফেরার প্রস্তুতি নিই। রশি খুলে মাঝি ইঞ্জিন চালু করার চেষ্টা করেন। ঘটঘট শব্দ করে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়, বারবার চেষ্টা করেও আর চালু হয়নি। ভাটির টানে ট্রলার ভেসে যাচ্ছিল। বন বিভাগের একটি ছোট নৌকা ট্রলারটিকে টেনে কালাবাগী বাজারের ঘাটের পাশে নিয়ে যায়। তখনো আশা ছিল, কিছুক্ষণের মধ্যে ইঞ্জিন ঠিক হয়ে যাবে।

সূর্য ডুবে গেলে চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে যায়। সময় গড়ায়, কিন্তু ইঞ্জিন সচল হয় না। রাত ৯টার দিকে মাঝি হতাশ কণ্ঠে জানান, আর চালু করা সম্ভব নয়। মুহূর্তে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, কারণ ট্রলারে নারী ও শিশু ছিল। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে বাতাস বাড়ছিল, আর জোয়ার শুরু হয়। আমাদের ট্রলারে পর্যাপ্ত আলো ও লাইফ জ্যাকেটের (life jacket) ব্যবস্থা ছিল না। নির্জন নদীপথে জলদস্যুর আশঙ্কাও ভয় বাড়িয়ে দেয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। চারপাশে শুধু অন্ধকার, ঢেউয়ের শব্দ আর সুন্দরবনের নিস্তব্ধতা। স্ত্রী-সন্তানদের পাশে নিয়ে সেই সময় পার করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।

বিপদের রাতে সহায়তার হাত

সেই সময় এক স্থানীয় মাঝি শক্তিশালী আরেকটি বোট নিয়ে এগিয়ে আসেন। রাতের অন্ধকারে উত্তাল নদীর মধ্যে তাঁর বোটের পেছনে আমাদের ট্রলার শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়। শুরু হয় কয়রার পথে ফেরা। শিবসার ঢেউ আর অন্ধকারের মধ্যে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে বোটটি। উৎকণ্ঠা কাটেনি, তবে নিরাপদে ঘাটে পৌঁছানোর আশা তৈরি হয়।

রাত ১২টার পর আমরা সুতির অফিস লঞ্চঘাটে পৌঁছাই। সেখানে টহলে ছিলেন কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন। আমাদের বিপদের কথা শুনে তিনি সুন্দরবন ভ্রমণে আরও সচেতন ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। রাত ১২টা ৪০ মিনিটে আমরা নিরাপদে বাড়ি ফিরি। স্বস্তি ফিরলেও শিবসার বুকে কাটানো সেই দীর্ঘ রাতের ভয় সহজে ভোলার নয়।

পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি

সুন্দরবন প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে দুর্গম নদীপথে ভ্রমণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, পর্যটকবাহী প্রতিটি ট্রলারে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, কার্যকর ইঞ্জিন, জরুরি আলো এবং যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বিপদে পড়া পর্যটকদের দ্রুত সহায়তা দিতে উদ্ধারব্যবস্থাও আরও কার্যকর করা জরুরি। নারী ও শিশুদের নিয়ে ভ্রমণে এসব প্রস্তুতি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা উচিত নয়।

এমন অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মুখোমুখি যেন আর কোনো পর্যটককে হতে না হয়, সে জন্য বোটমালিক, পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বন বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের আনন্দ যেন নিরাপত্তাহীনতার কারণে দুঃসহ স্মৃতিতে পরিণত না হয়, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

প্রতিবেদনটি আপনার কাছে কেমন লাগল?

হাফিজুর রহমান

জেলা প্রতিনিধি

এই প্রতিবেদনে কোনো তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে সংশোধনী নীতি অনুযায়ী আমাদের জানান।

মন্তব্য

মন্তব্য দেখতে বা লিখতে চাপ দিন। মন্তব্য সম্পাদকীয় নীতিমালা মেনে প্রকাশ হয়।

সারাংশ

ইঞ্জিন বিকল হয়ে শিবসায় আটকে ১২ জন, সুন্দরবন ভ্রমণের এক ভয়াবহ রাত

৯ অক্টোবর শুক্রবার কয়রা থেকে ১২ জনের একটি পর্যটক দল কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের ঘাট থেকে ট্রলারে সুন্দরবন ভ্রমণে যায়।
বিকেল ৪টার দিকে কালাবাগী এলাকায় ইঞ্জিন বিকল হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করেও চালু না হওয়ায় রাত ৯টার দিকে মাঝি জানান, ইঞ্জিন আর চালু করা সম্ভব নয়।
লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, ট্রলারে পর্যাপ্ত আলো ও লাইফ জ্যাকেট ছিল না এবং এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল না।
স্থানীয় এক মাঝির শক্তিশালী বোটে টেনে রাত ১২টার পর সুতির অফিস লঞ্চঘাটে পৌঁছান তাঁরা। লেখক ট্রলারে নিরাপত্তাসামগ্রী ও উদ্ধারব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।

#Sundarbans #Koyra #Khulna #TourismSafety #MeehaNews

আজ

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ৩০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি

পাঠের রং

এখন যা বেশি খোঁজা হচ্ছে

যেকোনো পাতায় / চাপলেই খোঁজ খুলবে। ফলাফলে বিভাগ, তারিখ ও ধরন দিয়ে ছাঁকতে পারবেন।