মূল কনটেন্টে যান
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার ১২ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ৩০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
অনুসন্ধানী ও সর্বশেষ বাংলা সংবাদ
প্রবন্ধ

কাশবনের দোলায় শরৎ ফিরে আসে, নাকি আমরাই ফিরি?

পদ্মার চরে কাশফুলের বনে শরতের নীল আকাশ ও সাদা মেঘ
নদীর পাড়ে কাশফুলের দোল: শরৎ এলে বাংলার আকাশ আর মাটি একই সুরে বাজে।

ভাদ্রের শেষ দুপুরে আকাশ হঠাৎ এত নীল হয়ে যায় যে মনে হয়, কেউ সারা রাত জেগে তাকে ধুয়েছে। ধোয়া সেই আকাশের নিচে নদীর পাড়ে কাশবন দুলতে থাকে, যেন বর্ষার ক্লান্ত নদীকে কেউ সাদা চামর দুলিয়ে বাতাস করছে। বাতাসে তখন ভেজা মাটির গন্ধ আছে, আছে পাকতে-থাকা ধানের হালকা মিষ্টতা। সেই গন্ধের ভেতরেই টের পাওয়া যায়, ঋতুটা বদলে গেছে।

এই বদলকে আমরা নাম দিয়েছি শরৎ।

শরৎ নিয়ে কথা শুরু করার আগে একটা প্রশ্ন রাখা যাক, যার উত্তর লেখার শেষে খুঁজব। শরৎ কি সত্যিই প্রতি বছর ফিরে আসে, নাকি ফিরে আসি আমরাই, স্মৃতির পুরোনো ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে?

ঋতুর পালাবদল

বছরকে বাংলা ছয় ভাগে ভেঙেছে, আর প্রতিটি ভাগের একটা মেজাজ বসিয়েছে। গ্রীষ্ম রুক্ষ, বর্ষা উদ্দাম, শীত নীরব, বসন্ত চঞ্চল। শরৎ সেই সারির একমাত্র ঋতু, যে কিছু দাবি করে না। ভাদ্র আর আশ্বিন মিলে তার রাজত্ব, বছরের ছয় ভাগের এক ভাগ, অথচ স্মৃতির খাতায় তার জায়গা অনেক বেশি।

বর্ষা যায় কিন্তু একেবারে যায় না। নদীতে তখনো জল থাকে, উঠানের কোণে থাকে ভিজে স্যাঁতা ভাব, আর আকাশে মাঝে মাঝে জমা হয় শেষ মেঘের দল। তবে সেই মেঘ আর আগের মতো কালো নয়, হয়ে ওঠে তুলোর মতো সাদা। তুলোর সেই ভেলা আকাশের নীলে ভেসে যায় ধীরে, যেন ছুটি পাওয়া কোনো স্কুলের ছেলেমেয়ে।

(ছেলেবেলায় ভাবতাম, মেঘেরাও বুঝি পরীক্ষা শেষে ছুটি পায়; বর্ষার পরীক্ষায় পাস করেই তারা সাদা পোশাক পরে।)

এই ধীর লয়ের ভেতর একটা সূক্ষ্ম নিয়ম কাজ করে। বর্ষা শেষ করে দেয় যা পুরোনো, শরৎ সাজায় যা আসছে। বর্ষার জল মাঠে পলি রেখে গেছে, শরৎ সেই পলির বুকে ধানের শিষে সবুজ থেকে সোনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় দেয়।

কাশ, শিউলি আর শিশিরের সকাল

কাশফুলের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে, সে ঘন হয়ে ফোটে না, ফোটে হালকা হয়ে। দূর থেকে মনে হয় নদীর চর জুড়ে কেউ সাদা কাপড় শুকাতে দিয়েছে। কাছে গেলে দেখা যায় প্রতিটি শিষ পাতলা আর ভঙ্গুর, বাতাসে নুয়ে পড়ে আবার সোজা হয়। ভঙ্গুরতার ভেতর এই সোজা হয়ে ওঠাটাই বোধ হয় তার সৌন্দর্য।

সৌন্দর্যের পাশেই আসে ঘ্রাণ। ভোর হওয়ার আগে শিউলি গাছের তলায় ঝরে পড়ে কমলা বোঁটার সাদা ফুল, যেন রাতভর কেউ নিঃশব্দে তারা ছিটিয়ে গেছে। ঘাসে তখনো শিশির, পায়ের পাতা ভিজে যায় ঠান্ডা স্পর্শে। সেই ভেজা পা নিয়ে আঁচলে ফুল কুড়ানো দিদিমাকে মনে পড়ে, যিনি বলতেন, শিউলি কুড়াতে হয় সূর্য ওঠার আগে, নইলে ঘ্রাণ চলে যায়।

ঘ্রাণ চলে যায়, কিন্তু মনে থেকে যায়। আমরা অনেকে শহরে এসে শিউলির নামটুকু মনে রেখেছি, গাছটা রাখিনি। অথচ আশ্বিনের সকালে কোনো বাসার ছাদের টবে একটা শিউলি-চারা বেঁচে থাকলে ফুল ঠিকই আসে, যেন সে জানে, ঋতু ভুললেও সে ভুলবে না।

ইতিহাসের উঠানে শরৎ

শরৎকে কেবল রূপের ঋতু বলা অসম্পূর্ণ, কারণ বাংলার ইতিহাস শরৎকে ক্ষুধার ঋতু হিসেবেও চেনে। আশ্বিন-কার্তিকে পুরোনো ধান ফুরিয়ে যায়, নতুন ধান তখনো ওঠে না। উত্তরবঙ্গের মানুষ এই ফাঁকা সময়কে চেনে মঙ্গা নামে। মাথার ওপর নীল আকাশ আর পায়ের নিচে সোনা-হতে-থাকা মাঠ, অথচ হাঁড়িতে চাল নেই।

এই বৈপরীত্য আজকের নয়। ১৯০৭ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার গ্রন্থাগার থেকে যে পুঁথি আবিষ্কার করেছিলেন, সেই চর্যাপদের কবিদের কণ্ঠেও অভাবের আক্ষেপ ছিল, ছিল ঘরে খাবার না থাকার কথা। হাজার বছর আগের সেই কবি আর আজকের কাঁচাবাজারে চালের দর শুনে মাথায় হাত দেওয়া মানুষ একই নদীর দুই পারের বাসিন্দা। একজনের হাতে ছিল তালপাতার পুঁথি, আরেকজনের হাতে মোবাইলের পর্দা, কিন্তু প্রশ্নটা এক: এই সুন্দর আকাশের নিচে পেট ভরবে কীভাবে?

দূর দেশের ইতিহাসেও এর ছায়া মেলে। নীল নদের বার্ষিক বন্যা মিশরের জমিতে পলি ফেলে যেত, আর সেই পলির ভরসায় গোটা সভ্যতা অপেক্ষা করত নতুন ফসলের। বাংলার বদ্বীপও তেমনি অপেক্ষার ভূমি। বন্যা যেখানে ক্ষতি করে, সেখানেই সে নতুন মাটিও গড়ে, আর শরৎ হলো সেই অপেক্ষার সবচেয়ে মোলায়েম অধ্যায়।

উৎসব, নবান্ন আর ঘরে ফেরা

অপেক্ষা ফুরোলে আসে উৎসব। শরতের আকাশে ঢাকের শব্দ ওঠে, দুর্গোৎসবের মণ্ডপে প্রদীপ জ্বলে, আর পাড়ায় পাড়ায় নতুন জামার গন্ধ ছড়ায়। এই উৎসব বাংলার বহুস্তরী উত্তরাধিকারের এক উজ্জ্বল পাতা, যেখানে ধর্মীয় আচারের সঙ্গে মিশে আছে ঘরে ফেরার, দেখা হওয়ার, একসঙ্গে বসার আকুতি। যাঁরা এই উৎসব পালন করেন, তাঁদের কাছে এটি ভক্তির দিন। যাঁরা পালন করেন না, তাঁরাও পাশের বাড়ির আলো আর ঢাকের শব্দে টের পান, ঋতু বদলেছে।

আর কিছুদিন পরেই নবান্ন। নতুন ধানের প্রথম ভাত, গুড়-পিঠা-পায়েসের সুবাস, মাঠে মাঠে কাস্তের ঝিলিক। নবান্ন আসলে একটা ধন্যবাদের উৎসব, মাটির কাছে, শ্রমের কাছে, সৃষ্টিকর্তার কাছে। এই কৃতজ্ঞতার ভেতর শোকর আছে, আছে ধৈর্যের পুরস্কার পাওয়ার সবরও।

(মঙ্গার মাস পেরিয়ে নতুন ধানের ভাত মুখে তোলার আনন্দ বুঝি তাঁরাই জানেন, যাঁদের হাঁড়ি কখনো টানাটানিতে ছিল।)

শরৎ এভাবে প্রকৃতিকে সংস্কৃতির সঙ্গে সেলাই করে। রবীন্দ্রনাথ শরতের গান লিখেছিলেন, নজরুল লিখেছিলেন, লোককবিরাও লিখেছিলেন। আমরা যে এখনো সেই গান গাই, তার কারণ বোধ হয় এই, এ ঋতু আমাদের শেখায় আনন্দ কীভাবে অপেক্ষার পরে আসে।

বিপরীত কণ্ঠ: এ কি কেবল স্মৃতির বিলাস?

এখানে একজন প্রশ্ন তুলতে পারেন, আর প্রশ্নটা অযৌক্তিক নয়। তিনি বলবেন, শরতের এই ছবি আসলে অতীতের, আজকের নয়। জলবায়ুর বদলে ঋতুর সীমা ঝাপসা হয়ে এসেছে। ভাদ্র মাসেও কখনো ঝুম বৃষ্টি, কখনো গুমোট, কাশবন অনেক নদীতীরে কমছে, আর নগরের শিশু শিউলি বা কাশফুল চেনে না, চেনে ছবির বইয়ের পাতা দিয়ে। তাঁর যুক্তিতে, আমরা যাকে শরৎ বলে ডাকি, তা আসলে স্কুলপাঠ্য বইয়ের সাজানো ঋতু, মাঠের বাস্তব নয়। আর যাঁরা মঙ্গার মতো কঠিন সময় পার করেন, তাঁদের কাছে কাশফুলের সৌন্দর্য নিছক বিলাস, কারণ খালি পেটে কবিতা চলে না।

এই কথা ফেলে দেওয়ার নয়, কারণ এতে সত্য আছে। ঋতুর চেহারা সত্যিই বদলাচ্ছে, আর শহুরে শিশুর মনে শিউলির জায়গা সত্যিই কমছে। ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে শুধু সৌন্দর্যের গুণগান সত্যিই অসংবেদনশীল।

তবু একটা জায়গায় আমি দ্বিমত করব। সৌন্দর্য আর প্রয়োজন পরস্পরের শত্রু নয়, তারা একই সংসারের দুই সদস্য। যে মানুষ মঙ্গার মাসে আকাশের নীলের দিকে তাকায়, সে ওই নীলে ভরসা খোঁজে, ফসল আসছে বলে। চর্যাপদের কবিও অভাবের কথা বলেছেন গানে, কারণ গান বাঁচার একটা উপায়। আর ঋতুর স্মৃতি যদি বিলাস হয়, তবে সেই বিলাসটুকু কেড়ে নিলে আমাদের হাতে থাকে কেবল হিসাবের খাতা।

(আর হিসাবের খাতা যত নিখুঁতই হোক, তাতে কেউ কখনো শিউলির ঘ্রাণ খুঁজে পায়নি।)

ঘরের কোণে বিশ্ব, মাটির কোণে স্মৃতি

জাপানিরা ভাঙা পেয়ালা সোনালি জোড়ে মেরামত করে, নাম দিয়েছে কিন্তসুগি। ভাঙা অংশটা তারা লুকায় না, বরং সোনা দিয়ে চিনিয়ে দেয়। বাংলার শরৎও ঠিক এমন এক মেরামতের ঋতু। বর্ষার ভাঙনে নদীর পাড় ভেঙেছে, ঘর ভেসেছে, কিন্তু শরৎ এসে ভাঙা জায়গায় কাশের সাদা আর ধানের সোনা বসিয়ে দেয়।

আমরা যদি সেই মেরামতের সঙ্গে হাত মেলাই, তবে শরৎ সত্যিই টিকে থাকবে। কীভাবে? নদীর পাড়ে কাশবন বাঁচাতে, উঠানের কোণে একটা শিউলি-চারা রোপণ করতে, শিশুকে সন্ধ্যায় মোবাইল থেকে চোখ তুলে আকাশ দেখাতে। মোবাইলের পর্দায় শরতের ছবি দেখা মন্দ নয়, তবে সেই ছবির পাশে যদি মাটির গন্ধ না থাকে, তবে তা আধখানা ঋতু।

প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে, ফেসবুক লাইভে উৎসবের ঢাকের শব্দ এখন সাত সমুদ্র পারের প্রবাসীর ঘরেও পৌঁছে যায়। এটা পাওয়া। কিন্তু হারানোর প্রশ্নটাও থাকে, সেই ঢাকের শব্দ শুনে প্রবাসীর বুকের ভেতর যে ছোট্ট ব্যথা জাগে, তার ওষুধ কি কোনো অ্যাপে আছে?

সমাপ্তি: আকাশ ধোয়ার পর

শুরুতে একটা প্রশ্ন ঝুলিয়ে রেখেছিলাম, শরৎ ফিরে আসে, নাকি আমরাই ফিরি। এবার উত্তরটা বলা যায়, যদিও পুরোপুরি নয়। শরৎ ফিরে আসে ঠিকই, নিয়ম মেনে, বছর ঘুরে। কিন্তু সে ফেরাটা অর্থপূর্ণ হয় কেবল তখন, যখন আমরাও ফিরি, চোখ তুলে, নাক টেনে, হাত বাড়িয়ে।

সন্ধ্যা নামলে নদীর ঘাটে নৌকাগুলো একে একে ভেড়ে। কাশবনের সাদা তখন ধূসর হয়ে আসে, শিউলির ঘ্রাণ বাড়ে, আর পশ্চিম আকাশের শেষ আলোয় নীলটা একটু একটু করে গাঢ় হয়। কেউ একজন, হয়তো কোনো মা, হারিকেন জ্বালিয়ে দাওয়ায় বসে অপেক্ষা করেন।

আকাশটা আবার ধোয়া হবে কাল ভোরে। কেউ সারা রাত জেগে তাকে ধোবে, যেমন প্রতিবছর ধোয়, আমরা ফিরি বা না ফিরি।

লেখাটি ছুঁয়ে গেলে জানান

আবু আনান

বিশেষ প্রতিবেদক

এই প্রতিবেদনে কোনো তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে সংশোধনী নীতি অনুযায়ী আমাদের জানান।

মন্তব্য

মন্তব্য দেখতে বা লিখতে চাপ দিন। মন্তব্য সম্পাদকীয় নীতিমালা মেনে প্রকাশ হয়।

  • কন্যাশিশুর অধিকার: আগামী বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার

    - কন্যাশিশুর অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সবার দায়িত্ব। - বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, লিঙ্গবৈষম্য দূর করা এবং…

    আবু আনান

  • এবার আর ঘুম ভাঙতে চাইব না

    বহুদিন পর স্বপ্নে ফিরে আসা স্কুলজীবনের বন্ধুকে ঘিরে এক আবেগঘন চিঠি, যেখানে ফোন নম্বর ভুলে গেলেও অটুট থেকে গেছে বেঞ্চের স্মৃতি, সহপাঠীদের…

    M M Masum Billah

সারাংশ

কাশবনের দোলায় শরৎ ফিরে আসে, নাকি আমরাই ফিরি?

ভাদ্র ও আশ্বিন মিলে শরৎ। নীল আকাশ, কাশবন, শিউলি আর শিশিরভেজা সকাল এই ঋতুর চেনা ছবি।
লেখাটি শরৎকে বাঙালির সংস্কৃতি, উৎসব, নবান্ন, এমনকি মঙ্গার স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখে।
জলবায়ু বদলে ঋতুর চেহারা ঝাপসা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলে লেখাটি শরৎকে ধরে রাখার দায়ের কথা বলে।
#Sharat #Bangladesh #BengaliCulture #Nobanno #MeehaNews

আজ

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ৩০ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি

পাঠের রং

এখন যা বেশি খোঁজা হচ্ছে

যেকোনো পাতায় / চাপলেই খোঁজ খুলবে। ফলাফলে বিভাগ, তারিখ ও ধরন দিয়ে ছাঁকতে পারবেন।