প্রধান কন্টেন্টে যান
রবি ৪ অক্টোবর ২৬
হেডলাইন
বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন
পাঠক কথন / ক্যাম্পাস ভাবনা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: আমরা কি আরও কাছাকাছি, নাকি আরও একা?

মোট শেয়ারমোঃ: 2

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: আমরা কি আরও কাছাকাছি, নাকি আরও একা?
ছবিঃ আল রাইসা, শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

একসময় দূরে থাকা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চিঠি লিখতে হতো, ফোন করতে হতো কিংবা দেখা করার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। এখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা একজন মানুষের সঙ্গেও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যোগাযোগ করা সম্ভব। ফেসবুক (Facebook), ইনস্টাগ্রাম (Instagram), হোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp), মেসেঞ্জার (Messenger), টিকটক (TikTok) কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের যোগাযোগের ধরনকে আমূল বদলে দিয়েছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি সত্যিই আমাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, নাকি অজান্তেই আমাদের আরও একা করে তুলছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক দিক অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দূরে থাকা পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, বিভিন্ন বিষয়ে মতামত প্রকাশ করা, শিক্ষামূলক তথ্য পাওয়া কিংবা কোনো সামাজিক সমস্যার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি—সবকিছুই এখন অনেক সহজ। বিশেষ করে তরুণদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জ্ঞান, যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

তবে সমস্যাটি শুরু হয় যখন যোগাযোগের পরিমাণ এবং সম্পর্কের গভীরতা এক জিনিস বলে মনে হতে থাকে। আমাদের ফোনে হয়তো শত শত বন্ধু, ফলোয়ার (follower) কিংবা পরিচিতজন রয়েছে। প্রতিদিন অনেক মানুষের পোস্ট দেখি, প্রতিক্রিয়া জানাই, মন্তব্য করি। কিন্তু দিনের শেষে সত্যিকার অর্থে নিজের কথা বলার মতো মানুষ কয়জন?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত তরুণ-তরুণী, একাকিত্ব ও সংযোগের প্রতীকী ছবি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত তরুণ-তরুণী, একাকিত্ব ও সংযোগের প্রতীকী ছবি

একজন মানুষ হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন নিজের হাসিমুখের ছবি প্রকাশ করছেন, কিন্তু বাস্তব জীবনে তিনি একাকিত্ব, উদ্বেগ কিংবা মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোই তুলে ধরি। ফলে অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবন তুলনা করার প্রবণতা তৈরি হয়। “ওর জীবন এত সুন্দর, আমারটা কেন এমন নয়?”—এই প্রশ্নটি ধীরে ধীরে নিজের প্রতি অসন্তুষ্টি তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, সম্পর্ক, চেহারা, জীবনযাপন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি নির্দিষ্ট “সফল জীবন”-এর ছবি আমাদের সামনে তুলে ধরে। ফলে অনেকেই মনে করতে পারেন, অন্য সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু তিনি পিছিয়ে আছেন।

এখানেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি সামাজিক দিক সামনে আসে। মানুষ শুধু অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে না; সে নিজের পরিচয়ও তৈরি ও প্রকাশ করে। আমরা কী ছবি দিচ্ছি, কী লিখছি, কোন বিষয় নিয়ে কথা বলছি কিংবা কোন পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি—এসবের মাধ্যমে আমরা অন্যদের কাছে নিজেদের একটি নির্দিষ্ট পরিচয় উপস্থাপন করি। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু যোগাযোগের জায়গা নয়; এটি নিজেকে উপস্থাপন করারও একটি সামাজিক মঞ্চ।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের অবশ্যই একা করে দেয়। বরং বিষয়টি নির্ভর করে আমরা কীভাবে এটি ব্যবহার করছি তার ওপর। একজন শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নতুন কিছু শিখতে পারেন, নিজের গবেষণার জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন, একই আগ্রহের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন কিংবা কোনো সামাজিক উদ্যোগে অংশ নিতে পারেন। আবার একই মাধ্যম অতিরিক্ত ব্যবহার করলে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, পড়াশোনা, ঘুম এবং ব্যক্তিগত সময়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে পারে।

তাই প্রশ্নটি হয়তো “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের কাছাকাছি আনে, নাকি দূরে সরিয়ে দেয়?”—এভাবে করা ঠিক নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—”আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কীভাবে ব্যবহার করছি?” অনলাইনে শত মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি বাস্তব জীবনের কয়েকজন মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করাও প্রয়োজন। কারণ একটি প্রতিক্রিয়া সবসময় সহানুভূতির বিকল্প নয়, একটি মন্তব্য সবসময় কথোপকথনের বিকল্প নয়, আর শত শত ফলোয়ার সবসময় একজন সত্যিকারের বন্ধুর বিকল্প নয়।

প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগের সুযোগ বাড়িয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব হলো সেই যোগাযোগকে অর্থবহ সম্পর্কের দিকে নিয়ে যাওয়া। হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের আরও কাছাকাছি এনেছে—কিন্তু সত্যিকারের কাছাকাছি থাকা এখনো নির্ভর করে আমাদের মানবিক সম্পর্ক, সময় এবং মনোযোগের ওপর।

শেষ পর্যন্ত, আমাদের ফোনের স্ক্রিনে কতজন মানুষ আছে সেটি হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো—স্ক্রিনের বাইরে আমাদের পাশে সত্যিই কতজন মানুষ আছে।

আল রাইসা
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

মোট শেয়ারমোঃ: 2

পোস্টটি কেমন লাগলো?

মন্তব্য করুন

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো * দ্বারা চিহ্নিত।

সম্পর্কিত খবর

সাম্প্রতিক খবর

সর্বাধিক পঠিত