শতবর্ষে ভাষাশহীদ রফিক

শত বছর আগে, ১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর, মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের পারিল গ্রামে আবদুল লতিফ ও রাফিজা খাতুনের ঘরে একটি ছেলের জন্ম হয়। নাম রাখা হয় রফিকউদ্দিন আহমদ। পাঁচ ভাই আর দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। ধলেশ্বরীর জলহাওয়ায় বেড়ে ওঠা গ্রামের এক সাধারণ মুসলিম পরিবারের সন্তান। তখন কেউ জানত না, এই নাম একদিন একটি জাতির ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারিখের সঙ্গে চিরকালের জন্য জুড়ে যাবে।
রফিকের জীবন ছিল সেই সময়ের আর দশজন তরুণের মতোই। ১৯৪৯ সালে বায়রা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু পড়া শেষ করেননি। চলে আসেন ঢাকায়, বাবার ছাপাখানার কাজে। সিসার হরফ সাজিয়ে কাগজে বাংলা অক্ষর ফুটিয়ে তোলাই ছিল সেই ছাপাখানার কাজ। ভাষার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাই কেবল আবেগের ছিল না, ছিল রুটিরুজিরও।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র-জনতা ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রফিক সেই মিছিলে ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে পুলিশ গুলি চালায়। একটি গুলি তাঁর মাথায় লাগে, ঘটনাস্থলেই তিনি শহীদ হন। লাশ নেওয়া হয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, রাত প্রায় তিনটায় সেনাপ্রহরায় আজিমপুর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। শাসকেরা চেয়েছিল শোক যেন জনতার হাতে না পৌঁছায়। পরে সেই কবর আর শনাক্ত করা যায়নি। রফিকের নির্দিষ্ট কোনো কবর নেই, কিন্তু প্রতিটি শহীদ মিনার তাঁর ঠিকানা।
যে তরুণেরা সেদিন রাজপথে নেমেছিলেন, তাঁদের বড় অংশই ছিলেন বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। মাত্র কয়েক বছর আগে তাঁরাই নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই রাষ্ট্র যখন তাঁদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চাইল, তাঁরা বুঝিয়ে দিলেন, ইমান আর মায়ের ভাষা একে অন্যের প্রতিপক্ষ নয়। নামাজের মোনাজাত আর মায়ের ঘুমপাড়ানি গান একই হৃদয়ে বাস করতে পারে। রফিকের রক্ত সেই সত্যের সাক্ষী।
স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁকে মনে রেখেছে। ২০০০ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়। জন্মগ্রাম পারিলের নাম এখন রফিকনগর। সেখানে ২০১০ সালে গড়ে উঠেছে ভাষাশহীদ রফিকউদ্দিন আহমদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। আজ শুক্রবার তাঁর জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হলো। পঁচিশ বছরের যে জীবন একটি গুলিতে থেমে গিয়েছিল, তা আজ এক শতাব্দীর সমান দীর্ঘ।
ইতিহাসে আজকের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
১৮৫৩: বিপ্লবী ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্রের জন্ম, চব্বিশ পরগনার নৈহাটিতে। ১৯০২ সালের ২৪ মার্চ তিনি ভারত অনুশীলন সমিতির পরিচালক নির্বাচিত হন এবং পরে সংগঠনটির নাম দেন অনুশীলন সমিতি। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের এই সংগঠন পূর্ববঙ্গেও বিস্তৃত হয়েছিল।
১৮৮৭: শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়ের জন্ম, কলকাতায়। তাঁর পৈতৃক নিবাস বৃহত্তর ময়মনসিংহের মসুয়া। ‘আবোল তাবোল’, ‘হ-য-ব-র-ল’, ‘পাগলা দাশু’র মতো লেখা বাংলা ননসেন্স সাহিত্যের ভিত গড়েছে।
১৯০১: কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম, কলকাতার হাতিবাগানে। তিনি তিরিশের দশকের আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। ১৯৩১ সাল থেকে বারো বছর ‘পরিচয়’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘অর্কেস্ট্রা’, ‘ক্রন্দসী’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’।
১৯৮৫: সাংবাদিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানীর মৃত্যু, ঢাকায়। সিরাজগঞ্জের কাউলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া লোহানী বিবিসিতে সাংবাদিকতা করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তাঁর উপস্থাপিত ‘যদি কিছু মনে না করেন’ দেশে মানসম্পন্ন টিভি অনুষ্ঠানের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত।




