স্টাফ রিপোর্টার ঢাকা, ২২ আগস্ট ২০২৬
দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের টানাপোড়েনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন খাতে বইয়ে দেওয়া তথা ‘রিসেট’ করার আগ্রহ এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে ঢাকার কূটনৈতিক তৎপরতায়। একের পর এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, বার্তা আদান-প্রদান আর সরকারি ব্রিফিংয়ে একই বার্তা দিচ্ছে বাংলাদেশ—প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক আর তিক্ততায় আটকে রাখতে চায় না তারা, তবে তার আগে প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা পুনরুদ্ধার।
পটভূমি: পটপরিবর্তনের পর অস্বস্তি
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়। হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে তাঁর সরকারের প্রতি ভারতের যে সমর্থন ছিল, তা স্বাভাবিক কূটনৈতিক চর্চার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলে ঢাকার নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ মনে করে। এর জেরে পরবর্তী সময়ে সীমান্ত হত্যা, ভিসা জটিলতা, বাণিজ্য বিধিনিষেধ এবং কূটনৈতিক মিশন ঘিরে বিক্ষোভের মতো একাধিক ঘটনা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে। গত ডিসেম্বরে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে একটি উগ্রপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের বিক্ষোভ ও হাইকমিশনারকে হুমকির ঘটনার জেরে সাময়িকভাবে ভিসা ও কনস্যুলার সেবাও বন্ধ রাখতে হয়েছিল ঢাকাকে।
সাম্প্রতিক মাসে সক্রিয় কূটনীতি
চলতি বছরের এপ্রিলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা খলিলুর রহমান দিল্লি সফরে গিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল, পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক করেন। মে মাসে দিল্লি সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি জানান, বাংলাদেশ তার অগ্রাধিকার ঠিক করলে দিল্লি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তিস্তার পানিবণ্টন, গঙ্গা চুক্তির নবায়ন, শেখ হাসিনার প্রত্যাবাসন, আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও ভিসা—এসব বিষয়েও তিনি প্রশ্নের জবাব দেন।
চলতি আগস্টে নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী পররাষ্ট্র উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পরদিনই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে পৃথক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন—যা ছিল প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর হাইকমিশনারের সঙ্গে তাঁর প্রথম বৈঠক। দুই পক্ষই এই বৈঠকগুলোকে সম্পর্কে ‘নতুন সূচনা’র ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, হাইকমিশনার এখন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলামের সঙ্গেও আলোচনার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
মূল অন্তরায়: হাসিনা প্রশ্নে আস্থার সংকট
সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা হয়ে আছে দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার ইস্যু। বাংলাদেশ শুরু থেকেই তাঁর প্রত্যর্পণ দাবি করে আসছে; পাশাপাশি শহীদ ওসমান হাদী হত্যা মামলায় অভিযুক্ত একজনকে ভারতে গ্রেপ্তারের পর তাঁরও প্রত্যর্পণ চাওয়া হয়েছে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি এই দুটি বিষয় তুলে ধরে ভারতের অগ্রগতি জানতে চেয়েছেন।
গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে শেখ হাসিনার এক প্রকাশ্য মতবিনিময় অনুষ্ঠান সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করে। ওই অনুষ্ঠানে হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন এবং বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলেন। জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এটিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা আখ্যা দিয়ে হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে। অন্যদিকে ভারতের বক্তব্য, ওই সংবাদ সম্মেলন আয়োজনে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্যকে তারা সমর্থন করে না।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, হাসিনা প্রশ্নে ভারত তার অবস্থান স্পষ্ট করলে দুই দেশের মধ্যকার আস্থার সংকট অনেকটাই কাটতে পারে। গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঢাকা এই বার্তাই দিল্লিকে জানিয়েছে বলে সরকারি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অনুকূল পরিবেশের দাবিতে অনড় ঢাকা
সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ঘিরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে, সফরের আগে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ের এক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র জানান, সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতেই প্রতিবেশীসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার নীতি—সরকার যাকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বলে অভিহিত করছে—অব্যাহত থাকবে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের ধারণা, বাংলাদেশের এই কঠোর অবস্থানের কারণেই ভারতকে কিছুটা নমনীয় হতে দেখা যাচ্ছে, যদিও এখনই কোনো একক সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন তাঁরা। তাঁদের ধারণা, সামনের অগ্রগতি মূলত রাজনৈতিক পর্যায়ের আলোচনার মধ্য দিয়েই আসতে পারে।
ব্রিকস সম্মেলনকে ঘিরে সম্ভাবনা
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনকে দুই দেশের সম্পর্কে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। দিল্লির কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ব্রিকস আউটরিচ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত, সঙ্গে রয়েছে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও। ঢাকায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধানসহ বেশ কয়েকজনের সাম্প্রতিক সফরকে এই বার্তার আভাস হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দিল্লির কূটনৈতিক মহলে এটিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের মধ্যে সম্ভাব্য প্রথম সরাসরি বৈঠকের মঞ্চ হিসেবেও গণ্য করা হচ্ছে।
অন্যান্য অমীমাংসিত ইস্যু
হাসিনা প্রশ্ন ছাড়াও তিস্তার পানিবণ্টন, গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন ও তাতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ পুনরুদ্ধার, সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশিদের প্রাণহানি, ভিসা জটিলতা এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর মতো একাধিক বিষয় দুই দেশের সম্পর্কের আলোচ্যসূচিতে রয়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি ছাড়া সম্পর্কের প্রকৃত অর্থে ‘রিসেট’ সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ।
নতুন রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপট
এদিকে গত ২১ আগস্ট বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ইতিমধ্যে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতিসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা। নতুন রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের অধীনে সম্পর্ক কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়ে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছেন দুই দেশের পর্যবেক্ষকরাই।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের প্রেক্ষাপটে ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতিতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার অব্যাহত থাকবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তবে তাঁদের অনেকেই মনে করছেন, শুধু ঘোষণা বা সৌজন্য বৈঠকেই সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না; বাস্তবায়নই হবে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের আসল পরীক্ষা। একজন ভারতীয় বিশ্লেষকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করাই এখন সম্পর্ক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার প্রথম শর্ত।
উপসংহার
সব মিলিয়ে যে চিত্র উঠে আসছে তা হলো—ঢাকা সম্পর্ককে ‘রিসেট’ করতে আগ্রহী, তবে তা শর্তহীন নয়। শেখ হাসিনা প্রশ্নে দিল্লির স্পষ্ট অবস্থান, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরের অনুকূল পরিবেশ এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধান—এই তিন শর্ত পূরণ হলেই সম্পর্কে প্রকৃত অর্থে নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে বলে ধারণা কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। আগামী সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলন এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।















মন্তব্য করুন