ঢাকা, ২২ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে বাকি মাত্র চার মাসের কিছু বেশি সময়, অথচ এখনো আনুষ্ঠানিক নবায়ন আলোচনা শুরু না হওয়ায় খোদ ভারতের পার্লামেন্টেই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দেশটির লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সম্প্রতি সংসদে পেশ করা এক প্রতিবেদনে অবিলম্বে ঢাকার সঙ্গে আলোচনা শুরুর তাগিদ দিয়েছে।
কংগ্রেসের সংসদ সদস্য শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি তাদের পঞ্চদশ ‘অ্যাকশন টেকেন রিপোর্টে’ সতর্ক করে বলেছে, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আলোচনা শুরু না হলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছে প্যানেলটি।
চুক্তির প্রেক্ষাপট
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই হিসাবে চলতি বছরের ডিসেম্বরেই চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, ফারাক্কায় গঙ্গার পানিপ্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম থাকলে দুই দেশ সমান হারে ভাগ করে নেয়। প্রবাহ ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পায় ৪০ হাজার কিউসেক, বাকিটা ভারতে। আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পায় ৪০ হাজার কিউসেক, অবশিষ্ট পানি যায় বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে থাকা ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে একমাত্র গঙ্গার ক্ষেত্রেই এ ধরনের আনুষ্ঠানিক পানিবণ্টন চুক্তি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা তিস্তার পানিবণ্টন প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ভারতীয় সংসদীয় কমিটি যা বলেছে
সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, পানি বণ্টন কেবল একটি কারিগরি বিষয় নয়—এটি উভয় দেশের কোটি কোটি মানুষের কৃষি, জীবিকা ও সুপেয় পানির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যের রাজনীতিতেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
কমিটি এর আগেও চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই আলোচনা শুরুর সুপারিশ করেছিল, পাশাপাশি হালনাগাদ জলবায়ু ও হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য বিশ্লেষণ করে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজস্ব দরকষাকষির কৌশল প্রস্তুত রাখতে সরকারকে তাগিদ দিয়েছিল। জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে গঠিত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি চুক্তির অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার কাজ করছে এবং বাংলাদেশের নতুন সরকারের অধীনে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
তবে এই জবাবে সন্তুষ্ট হয়নি কমিটি। প্যানেলের ভাষ্য, মন্ত্রণালয় তিন বছরের প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন করলেও অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা শেষ হয়েছে কি না বা ভারতের প্রস্তাবিত কাঠামো কী হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি মন্ত্রণালয়। তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়াতেও হতাশা প্রকাশ করেছে কমিটি।
কমিটি সরাসরি বলেছে, ভারত সরকার এখন আর কেবল পদ্ধতিগত পর্যালোচনা বা প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠকের ওপর নির্ভর করতে পারে না। এমনও উল্লেখ করা হয়েছে যে কমিটির দেওয়া মোট ৩৩টি সুপারিশের মধ্যে সরকার ২৫টি গ্রহণ করলেও গঙ্গা চুক্তি নবায়ন ও নদী সহযোগিতা সংক্রান্ত বাকি আটটি সুপারিশে এখনও পূর্ণাঙ্গ জবাব দেয়নি।
এর আগে লোকসভায় সরকারের অবস্থান
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের লোকসভায় এক অ-তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং জানিয়েছিলেন, গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা তখনও শুরু হয়নি। তবে তিনি জানান, চুক্তি নবায়ন প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি প্রতিনিধিদল বিভিন্ন সময়ে আন্তমন্ত্রণালয় আলোচনায় অংশ নিয়েছে।
বাংলাদেশের অবস্থান
এদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও নতুন চুক্তির প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে এসেছে। গত ১৯ আগস্ট রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক সেমিনারে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, নতুন গঙ্গা চুক্তিতে আগের চুক্তির ত্রুটিগুলো রাখতে চায় না সরকার। তিনি বলেন, এই চুক্তি করতেই হবে, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় নেওয়া হবে। একই অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা নতুন চুক্তিতে পানি সংকটের সময় ন্যূনতম পানি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা যুক্ত করার পরামর্শ দেন।
উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালে সম্পাদিত আগের পানিবণ্টন চুক্তিটি ছিল মাত্র পাঁচ বছর মেয়াদি, যার পর ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত একটি সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে পানি বণ্টন চলে। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯৬ সালে সম্পাদিত হয় বর্তমান ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তিটি।
কূটনৈতিক তাৎপর্য
পর্যবেক্ষকদের মতে, দুই দেশের বর্তমান কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রতিবেদনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর একটি সুযোগ তৈরি হলেও অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতা সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে বলে ভারতীয় সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়েছে।
আপাতত দুই দেশের মধ্যে গঙ্গা পানি চুক্তির আনুষ্ঠানিক নবায়ন আলোচনা কবে শুরু হবে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনো জানা যায়নি।















আমাদের এই চুক্তিতে আসলেই কোন লাভ নেই। তারা কোন চুক্তি বাস্তবায়ন করে না।