বাংলাদেশে আল-কায়েদার সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি সতর্কবার্তা এবং সরকারের পক্ষ থেকে তা প্রায় নাকচ করে দেওয়ার প্রতিক্রিয়া—এই দুইয়ের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্বই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। গত কয়েক মাসে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বিস্ফোরক উদ্ধারের একাধিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই বিতর্ক আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
যা বলেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

সোমবার (১৭ আগস্ট) পে কমিশন সংক্রান্ত এক সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করে দেন, জাতিসংঘের এই সতর্কতা সরকার আমলে নিচ্ছে না। তিনি জানান, প্রতিবেদনটি তিনি এখনও পড়েননি, পত্রিকার মাধ্যমে যতটুকু জেনেছেন তাতে মনে হয়েছে বিষয়টি একেবারেই অনুমাননির্ভর একটি পর্যবেক্ষণ, যার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। এর আগে এপ্রিলেও তিনি দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হকও একই সুরে বলেছেন, এই মুহূর্তে জঙ্গি তৎপরতা বা নাশকতার কোনো আশঙ্কা তারা দেখছেন না। তবে সাম্প্রতিক বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোর সঙ্গে আল-কায়েদার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা তদন্তাধীন বলে তিনি স্বীকার করেছেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সুনির্দিষ্ট দাবি নিয়ে তিনি সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছেন।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’ গত ১০ আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৯ জুন পর্যন্ত সময়কালে আল-কায়েদা ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের মূল পর্যবেক্ষণগুলো হলো—
- আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (একিউআইএস) একটি বিক্ষিপ্ত-খণ্ডিত গোষ্ঠী থেকে ক্রমেই একটি সংগঠিত আঞ্চলিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কে রূপান্তরিত হচ্ছে।
- বড় ক্যাম্প বা দৃশ্যমান কাঠামোর বদলে তারা এখন বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট সেল-ভিত্তিক মডেলে কাজ করছে, পাশাপাশি গড়ে তুলেছে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক।
- সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্ব বর্তমানে আফগানিস্তানের কাবুলে অবস্থান করছে বলে দাবি করা হয়েছে, এবং তাদের তালেবান-স্বীকৃত পরিচয়পত্র (তাজকিরা) দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ আছে।
- ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লা এলাকায় সংঘটিত বিস্ফোরণের সঙ্গে একিউআইএস-সংশ্লিষ্টতার কথা প্রতিবেদনে দৃষ্টান্ত হিসেবে টানা হয়েছে।
- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, বাংলাদেশে নিজেদের স্থায়ী সেল বা ছোট সাংগঠনিক ইউনিট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সংগঠনটি—এমন তথ্য দিয়েছে ইউএনএসসি।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ায় একিউআইএসের সম্প্রসারণ নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ নতুন নয়। ২০২৩ সালের ৩২তম প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, আল-কায়েদা একিউআইএসকে বাংলাদেশ, ভারতের জম্মু-কাশ্মীর ও মিয়ানমারে বিস্তারের উপযোগী আঞ্চলিক কাঠামো হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে।
মাঠপর্যায়ের প্রেক্ষাপট: পরপর কয়েকটি বিস্ফোরক-উদ্ধার
জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের আগে-পরে দেশের অভ্যন্তরেও এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে:
- ১২ আগস্ট: সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরে একটি তিনতলা বাড়িতে সিটিটিসির অভিযানে ৯টি বিস্ফোরক ও প্রচুর গান পাউডারসহ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার হয়।
- ৩০ জুলাই: সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদিদোকানে ফেলে রাখা ভ্রমণ ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ।
- ২৪ জুলাই: ঢাকার মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি ছাতার ভেতরে রাখা বোমা উদ্ধার হয়।
এসব ঘটনার পাশাপাশি নিষিদ্ধ সংগঠন নব্য জেএমবির একটি চক্র নতুন করে সক্রিয় হওয়ার তথ্যও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এসেছে। এসব কারণেই পুলিশ সদর দপ্তর সম্প্রতি সারা দেশে সতর্কতা জারি করেছিল, বিশেষত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহনে হামলার আশঙ্কা থেকে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের পর্যবেক্ষণ
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহমদের মতে, প্রেশার কুকার, ছাতা কিংবা পাইপের মতো অপ্রচলিত উপায়ে তৈরি বিস্ফোরক ডিভাইস পাওয়ার ধরন দেখেই অনুমান করা যায় যে এর পেছনে বাইরে থেকে অর্থায়ন থাকতে পারে। তিনি এ প্রসঙ্গে বিশ্বজুড়ে চলমান প্রক্সি-যুদ্ধের ধরনের কথাও উল্লেখ করেছেন—যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে ছোট সংগঠনকে ব্যবহার করে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ হাসিল করে। তার আশঙ্কা, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে চাপে ফেলতে চাওয়া কোনো পক্ষ এ ধরনের তৎপরতার পেছনে অর্থায়ন করতে পারে বলেও তা অস্বাভাবিক নয়।
অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মী ও জঙ্গিবাদ-গবেষক নূর খান লিটনের মূল্যায়ন হলো, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় যেসব দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, উগ্র গোষ্ঠীগুলো তার সুযোগ নিতে পারে। কারাগার থেকে পালানো বা জামিনে মুক্তি পাওয়া উগ্রপন্থার সঙ্গে অতীতে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা নেই—এমন নিশ্চিত দাবি করার সুযোগ নেই।
সম্পাদকীয়-বিশ্লেষণ: আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতির প্রশ্ন
বিষয়টি নিয়ে প্রকাশিত একাধিক মতামত-নিবন্ধে একটি অভিন্ন সুর লক্ষ করা গেছে—’সেল গঠনের চেষ্টা’ এবং ‘একটি পূর্ণাঙ্গ কার্যকর নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়া’ এক জিনিস নয়, ফলে অতিরঞ্জিত আতঙ্কও যেমন কাম্য নয়, তেমনি সতর্কবার্তাকে সরাসরি খারিজ করে দেওয়াও দায়িত্বশীল আচরণ নয়। একিউআইএসের ইতিহাস বলছে, ২০১৪ সালে আত্মপ্রকাশের পর সংগঠনটির নাম অতীতে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ লেখক-ব্লগার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়েছিল। ফলে হুমকিকে খাটো করে দেখাটা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি প্রমাণ ছাড়া আতঙ্ক ছড়ানোও সামাজিক আস্থা নষ্ট করতে পারে এবং ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে জঙ্গিবাদকে গুলিয়ে ফেলার বিপদও তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের সুপারিশ মোটাদাগে চার-পাঁচটি জায়গায় কেন্দ্রীভূত—গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদার করা; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মে উগ্রপন্থী প্রচারণা পর্যবেক্ষণ বাড়ানো; অর্থের উৎস ও প্রবাহ চিহ্নিতকরণ; আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত সীমান্ত-নিরাপত্তা তথ্য বিনিময়; এবং সবকিছুর ঊর্ধ্বে, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের কাঠামোর মধ্যে থেকেই জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা দিল্লির লালকেল্লা বিস্ফোরণের (নভেম্বর ২০২৫) তদন্তে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) ২০২৬ সালের মে মাসে ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে, যেখানে আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের যোগসূত্রের অভিযোগ তোলা হয়। পাকিস্তানেও আল-কায়েদা ও তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) তৎপরতা দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ভৌগোলিকভাবে কৌশলগত অবস্থানে থাকা বাংলাদেশও এই আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রভাবের বাইরে নয় বলে সতর্ক করেছেন তারা।
ডেস্কের পর্যবেক্ষণ
সব সূত্র মিলিয়ে যে চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো—জাতিসংঘের প্রতিবেদন, মাঠপর্যায়ে বিস্ফোরক উদ্ধারের ধারাবাহিক ঘটনা এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা—এই তিনটি সূত্র একই দিকে ইঙ্গিত করলেও সরকারের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক নিরাসক্ত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিবেদনটি না পড়েই তা ‘অনুমাননির্ভর’ বলে খারিজ করে দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, হুমকি মূল্যায়নে সরকারের অগ্রাধিকার ঠিক কোথায়। অন্যদিকে সিটিটিসি নিজেই স্বীকার করছে, সাম্প্রতিক বিস্ফোরক-উদ্ধারের সঙ্গে আল-কায়েদা যোগসূত্র আছে কি না তা তদন্তাধীন—যা থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি পুরোপুরি অগ্রাহ্য করার মতো অবস্থাতেও সরকার নেই।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি বলে একিউআইএসের সংগঠিত নেটওয়ার্ক বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে—এমন উপসংহারে পৌঁছানো তাড়াহুড়া হবে। তবে জাতিসংঘের সতর্কবার্তা, স্বল্প ব্যবধানে ঘটা একাধিক বিস্ফোরক-উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে সরাসরি নাকচ না করে অন্তত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্তই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত পথ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।












মন্তব্য করুন