প্রধান কন্টেন্টে যান
শুক্র ২ October ২৬
হেডলাইন
বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন
বিশ্ব রাজনীতি / বিশ্ব রাজনীতি

চিকেন’স নেক: ২২ কিলোমিটার চওড়া যে করিডর নিয়ে কাঁপে দিল্লি, নজর রাখে বেইজিং

মোট শেয়ারমোঃ: 0

চিকেন’স নেক: ২২ কিলোমিটার চওড়া যে করিডর নিয়ে কাঁপে দিল্লি, নজর রাখে বেইজিং
ছবিঃ অনলাইন সংগৃহীত

একনজরে

  • শিলিগুড়ি করিডর বা “চিকেন’স নেক” — ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বের ৭-৮টি রাজ্যকে যুক্তকারী একমাত্র স্থলপথ, প্রস্থে মাত্র ২০-৬০ কিলোমিটার
  • এর দুই পাশে নেপাল ও বাংলাদেশ, কাছেই চীন ও ভুটান সীমান্ত — চারটি ভূ-রাজনৈতিক সীমান্তের সন্ধিস্থলে অবস্থান
  • ২০১৭ সালের ডোকলাম উত্তেজনার কেন্দ্র থেকে করিডরের দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারেরও কম
  • গত ৮ বছরে বিতর্কিত ডোকলাম অঞ্চলে অন্তত ২২টি গ্রাম-বসতি স্থাপন করেছে চীন, বলছে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ
  • ২০২৫ সালের মার্চে চীন সফরে গিয়ে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এক মন্তব্যে তোলপাড় হয়েছিল ভারতীয় রাজনীতিতে
  • চলতি সপ্তাহেই করিডরের নিরাপত্তায় “ত্রিকোণীয় গ্রিড” ঘোষণা করেছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ

দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে হাতেগোনা যে কয়েকটি স্থান নিয়ে বছরের পর বছর ধরে কৌশলগত বিশ্লেষণ চলছে, তার মধ্যে শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গের একটি সরু ভূখণ্ড — শিলিগুড়ি করিডর, যা বিশ্বজুড়ে পরিচিত “চিকেন’স নেক” নামে। দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো — কেন এই ছোট্ট ভূখণ্ডটি ভারত, চীন ও বাংলাদেশ তিন দেশের কূটনীতি ও নিরাপত্তা-আলোচনায় এত ঘন ঘন ফিরে আসে।

ভূগোল: কেন “মুরগির ঘাড়”

উইকিপিডিয়া ও একাধিক ভৌগোলিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত শিলিগুড়ি করিডরের আকৃতি সরু ও লম্বাটে হওয়ায় — অনেকটা মুরগির ঘাড়ের মতো দেখতে বলে — একে “চিকেন’স নেক” নাম দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে এর প্রস্থ নিয়ে সামান্য পার্থক্য থাকলেও (কোথাও ২০-৬০ কিলোমিটার, কোথাও ২১-৪০ কিলোমিটার), সব সূত্রই একমত যে এটি অত্যন্ত সংকীর্ণ একটি ভূখণ্ড। এই করিডরের মধ্য দিয়েই ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল প্রদেশ — এই “সেভেন সিস্টার্স” খ্যাত রাজ্যগুলো এবং সিকিম দেশটির মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। করিডরের পশ্চিমে নেপাল, পূর্বে বাংলাদেশ (পঞ্চগড় জেলা সংলগ্ন), আর উত্তরে ভুটান ও চীনের সীমান্ত।

সামরিক বিশ্লেষকরা করিডরটিকে “দোধারী তলোয়ার” বা “অ্যাকিলিসের গোড়ালি” বলেও অভিহিত করেন — কারণ এটি যেমন ভারতের ভৌগোলিক সংহতির প্রতীক, তেমনি এর সংকীর্ণতাই একে দুর্বলতার কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত করেছে। অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা কর্নেল রাকেশ বালির মতে, করিডরের গুরুত্ব বুঝতে শুধু এর আয়তন নয়, চারপাশের বাংলাদেশ, নেপাল, সিকিম ও চীন সীমান্তের পারস্পরিক সম্পর্কও একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

ডোকলাম: যেখানে প্রথম প্রকাশ্যে আসে দুর্বলতা

করিডরের ঝুঁকি প্রথম বড় পরিসরে প্রকাশ্যে আসে ২০১৭ সালে, যখন ভুটানের ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃত ডোকলাম মালভূমিতে সড়ক নির্মাণ নিয়ে চীন ও ভারতের সেনাবাহিনী প্রায় দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। তৎকালীন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ দাবি করেন, ভারত বিরোধপূর্ণ এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, আবার একই সময়ে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনী আধুনিকায়নে বাড়তি ২০ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ চায়। এই ডোকলাম মালভূমি থেকে শিলিগুড়ি করিডরের দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারেরও কম — একারণেই এই উত্তেজনাকে ভারত এত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল।

উত্তেজনা প্রকাশ্যে স্তিমিত হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনের বরাতে একাধিক বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে গত আট বছরে ডোকলাম অঞ্চলে অন্তত ২২টি গ্রাম ও বসতি স্থাপন করেছে চীন, পাশাপাশি একাধিক কংক্রিট হেলিপ্যাড, বাংকার, সুড়ঙ্গ ও নজরদারি টাওয়ারও নির্মাণ করেছে চীনা সেনাবাহিনী। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনেও ভুটানের ভূখণ্ডে চীনের এই নির্মাণ-তৎপরতাকে ভারতের পশ্চিম সেক্টর সীমান্তের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চীনের সম্ভাব্য আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার মুখে ভুটান ও ভারতের মধ্যে ১৯৪৯ ও ২০০৭ সালের “চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব” চুক্তিগুলোও এখন পরীক্ষার মুখে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: ইউনূসের মন্তব্যে তোলপাড়

চিকেন’স নেক নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশও একাধিকবার সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে চীন সফরে গিয়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস মন্তব্য করেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য (“সেভেন সিস্টার্স”) স্থলবেষ্টিত, আর এই অঞ্চলের জন্য সমুদ্রে যাওয়ার একমাত্র পথপ্রদর্শক বা “অভিভাবক” হলো বাংলাদেশ। পাশাপাশি চীনা অর্থনীতির সম্প্রসারণের জন্যও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এই মন্তব্য ভারতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সঞ্জীব সান্যাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রশ্ন তোলেন, ভারতের সাতটি রাজ্য স্থলবেষ্টিত হওয়ার প্রকৃত তাৎপর্য আসলে কী। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এক্সে মন্তব্য করেন, এই বক্তব্য ভারতের কৌশলগত চিকেন’স নেক করিডরের দীর্ঘদিনের দুর্বলতার ন্যারেটিভকেই সামনে এনেছে। দিল্লি সরকারিভাবে সরাসরি প্রতিক্রিয়া না জানালেও, পরবর্তীতে “সেভেন সিস্টার্স”কে বিমসটেকের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তুলে ধরার মাধ্যমে কূটনৈতিক জবাব দেয় ভারত। বাংলাদেশের কিছু সংবাদমাধ্যম ও কলামে অবশ্য এই প্রতিক্রিয়াকে “অতি প্রতিক্রিয়া” বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছে, যুক্তি দেখানো হয়েছে যে ইউনূসের বক্তব্য মূলত অর্থনৈতিক সংযোগ ও বাণিজ্য-সম্ভাবনা নিয়ে ছিল।

সাম্প্রতিক পদক্ষেপ: “ত্রিকোণীয় নিরাপত্তা গ্রিড”

এই দীর্ঘদিনের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটেই গত শুক্রবার শিলিগুড়ির রানিডাঙ্গায় সশস্ত্র সীমা বলের (এসএসবি) উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার হেডকোয়ার্টারে গিয়ে করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ঘোষণা দেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি জানান, চোপড়া, কিষাণগঞ্জ ও ধুবড়ি — এই তিনটি ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে একটি “বিশেষ ত্রিকোণীয় নিরাপত্তা গ্রিড” তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে পুরো করিডরে নজরদারি, সামরিক উপস্থিতি ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত “তিস্তা প্রহার” নামের সামরিক মহড়ার মাধ্যমেও অঞ্চলটি সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

একই অনুষ্ঠানে প্রায় ১৮০ কোটি রুপি ব্যয়ের একাধিক নতুন প্রশাসনিক ও আবাসিক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অমিত শাহ। এছাড়া “ভাইব্রেন্ট ভিলেজ প্রোগ্রাম ২.০”-এর আওতায় ৬,৮৩৯ কোটি রুপির একটি বৃহৎ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভুটান সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোকে সড়কপথে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

পর্যবেক্ষণ

চিকেন’স নেক নিয়ে আলোচনা মূলত তিনটি স্তরে চলমান — ভৌগোলিক বাস্তবতা (একটি সরু ভূখণ্ডের ওপর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ নির্ভরতা), সামরিক-কৌশলগত উদ্বেগ (ডোকলামকেন্দ্রিক চীনা তৎপরতা), এবং আঞ্চলিক কূটনীতি (বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওঠানামায় এই করিডরের বারবার উল্লেখ)। বিশ্লেষকদের মধ্যে করিডরের প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা নিয়ে মতভেদ থাকলেও, সাম্প্রতিক নিরাপত্তা বিনিয়োগ ও অবকাঠামো প্রকল্পগুলো স্পষ্ট করে দেয় — নয়াদিল্লি এই সংকীর্ণ ভূখণ্ডটিকে দেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনার একেবারে কেন্দ্রে রেখেছে।

মোট শেয়ারমোঃ: 0

পোস্টটি কেমন লাগলো?

মন্তব্য করুন

একটি মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো * দ্বারা চিহ্নিত।

সম্পর্কিত খবর

সাম্প্রতিক খবর

নেতানিয়াহুর ৮ ঘণ্টার সফর, ট্রাম্পহীন সাক্ষাৎ—পশ্চিমারা কি সত্যিই পতন চায়?

নেতানিয়াহুর ৮ ঘণ্টার সফর, ট্রাম্পহীন সাক্ষাৎ—পশ্চিমারা কি সত্যিই পতন চায়?

১ ঘণ্টা আগে
বন্ধ দরজা আর একটি ‘না’: স্বরা ভাস্করের সেই রাতের গল্প

বন্ধ দরজা আর একটি ‘না’: স্বরা ভাস্করের সেই রাতের গল্প

২ ঘণ্টা আগে
সাদের অনুরোধে বদলে গেল এলেনার গল্প: আগে ইন্দোনেশিয়া, এখন নেপাল

সাদের অনুরোধে বদলে গেল এলেনার গল্প: আগে ইন্দোনেশিয়া, এখন নেপাল

২ ঘণ্টা আগে
ময়মনসিংহে বাসচাপায় নিহত ৭, একই পরিবারের ৪ জন

ময়মনসিংহে বাসচাপায় নিহত ৭, একই পরিবারের ৪ জন

২ ঘণ্টা আগে
সুইচ আমাদের হাতে, বিদ্যুৎ কার হাতে?

সুইচ আমাদের হাতে, বিদ্যুৎ কার হাতে?

৭ ঘণ্টা আগে
নামফলকে লেখা হলো, মুছে গেল, আবার ফিরল—ঢাবির এক হল, দুই নাম আর অভ্যুত্থানের অসমাপ্ত প্রশ্ন

নামফলকে লেখা হলো, মুছে গেল, আবার ফিরল—ঢাবির এক হল, দুই নাম আর অভ্যুত্থানের অসমাপ্ত প্রশ্ন

১ দিন আগে
গোল নয় গোলপাতা: সুন্দরবনের সবুজ আচ্ছাদন, যার আড়ালে লুকিয়ে বাঘের নিঃশ্বাস

গোল নয় গোলপাতা: সুন্দরবনের সবুজ আচ্ছাদন, যার আড়ালে লুকিয়ে বাঘের নিঃশ্বাস

৫ দিন আগে
মেহেরুনকে নিয়ে ‘উধাও’ আইএইচটি শিক্ষক অসীম কুমার

মেহেরুনকে নিয়ে ‘উধাও’ আইএইচটি শিক্ষক অসীম কুমার

২ সপ্তাহ আগে

সর্বাধিক পঠিত