ভাওয়াইয়ার দরাজ কণ্ঠ

উত্তরবঙ্গের মাঠে গরুর গাড়ির চাকা ঘোরে, আর গাড়োয়ানের গলায় ওঠে ভাওয়াইয়ার টান। এই সুর বুকে নিয়েই ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর কোচবিহারের তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে জন্ম নেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ। বাবা জাফর আলী আহমদ ছিলেন তুফানগঞ্জ মহকুমা আদালতের আইনজীবী। আজ তাঁর ১২৫তম জন্মদিন।
গান শেখার প্রাতিষ্ঠানিক পথ তাঁর ছিল না। স্কুল-কলেজের অনুষ্ঠানে গাইতে গাইতে গলা তৈরি, পরে কলকাতায় কিছুদিন তালিম নেন ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খাঁর কাছে। ১৯৩১ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় কেরানির চাকরির ফাঁকে তাঁর গান উঠতে থাকে হিজ মাস্টার্স ভয়েস (HMV), মেগাফোনসহ নানা কোম্পানির গ্রামোফোন রেকর্ডে। ভাওয়াইয়া আর চটকা দিয়ে শুরু। এরপর ভাটিয়ালি, জারি, সারি, মুর্শিদি, মর্সিয়া, দেহতত্ত্ব, প্রায় সব ধারার লোকগানে তিনি হয়ে ওঠেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী দরাজ কণ্ঠ।
তাঁর সবচেয়ে বড় বিপ্লবটা ছিল অন্যখানে। দ্য ডেইলি স্টারের এক লেখায় তাঁর মেয়ে, শিল্পী ফেরদৌসী রহমান জানিয়েছেন, সে সময় রক্ষণশীল মুসলমানদের অনেকে গান গাওয়া, এমনকি শোনাকেও পাপ মনে করতেন। আব্বাসউদ্দীন চাইলেন বাংলায় ইসলামি গান রেকর্ড করতে। গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সাল ব্যবস্থাপক ভগবতীবাবু প্রথমে রাজি হননি, পরে মত দেন। কাজী নজরুল ইসলাম আধা ঘণ্টার মধ্যে লিখে ফেললেন ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। পরদিনই তা শিখে নিলেন আব্বাসউদ্দীন। গানটি জনপ্রিয় হলো, আর বাংলা ইসলামি গানের এক নতুন যুগের দরজা খুলে গেল। নজরুলের পাশাপাশি জসীমউদ্দীন আর গোলাম মোস্তফার ইসলামি গানও তাঁর কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে বাঙালি মুসলমানের ঘরে ঘরে।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, চল্লিশের দশকে তাঁর গান পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে মুসলমান জনমত গড়তে ভূমিকা রাখে। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় তিনি সরকারি রেকর্ডিং বিশেষজ্ঞের চাকরি পান। দেশভাগের পর ঢাকায় এসে যোগ দেন তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগে। পাকিস্তানের প্রতিনিধি হয়ে গান গেয়েছেন ম্যানিলা (১৯৫৫), জার্মানি (১৯৫৬) আর রেঙ্গুনে (১৯৫৭)।
১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। পরের বছর প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’। মৃত্যুর পর পেয়েছেন প্রাইড অব পারফরম্যান্স (১৯৬০), শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৯) আর স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৮১)। তাঁর সুরের উত্তরাধিকার বয়ে চলেছেন ছেলে মুস্তাফা জামান আব্বাসী, মেয়ে ফেরদৌসী রহমান আর নাতনি নাশিদ কামাল।
সোয়া শ বছর পরও প্রতিবছর রোজার শেষে চাঁদ ওঠার রাতে বাংলার ঘরে ঘরে বাজে সেই গান। খুশির ঈদের খবর তখনো প্রথম আসে আব্বাসউদ্দীনের গলায়।
ইতিহাসে আজকের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
১৬০৫ | মোগল সম্রাট আকবরের মৃত্যু
এদিন মারা যান মোগল সম্রাট জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সময়ে ১৫৭৫ সালের তুকারুইয়ের যুদ্ধে আর ১৫৭৬ সালের রাজমহলের যুদ্ধে বাংলার শেষ কররানি সুলতান দাউদ খান পরাজিত হন, রাজমহলে নিহত হন। বাংলা তখন নামমাত্র মোগল নিয়ন্ত্রণে আসে, পরিণত হয় সাম্রাজ্যের একটি সুবাহয়। কিছু ইতিহাসবিদের মতে, বঙ্গাব্দের প্রবর্তনও আকবরের আমলে।
১৯৫৮ | পাকিস্তানের ক্ষমতায় আইয়ুব খান
এদিন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা পদত্যাগ করেন এবং প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন সেনাপ্রধান আইয়ুব খান। তিন সপ্তাহ আগে, ৭ অক্টোবর, মির্জা নিজেই সামরিক শাসন জারি করে সংবিধান বাতিল করেছিলেন। আইয়ুবের অনুগত জেনারেলদের চাপে মির্জাকে কোয়েটায় পাঠানো হয়, পরে নির্বাসনে যান লন্ডনে। এভাবে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে শুরু হয় দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর্ব।




